নির্বাচনে কী লাভ হলো ইমরান খানের?

 

নির্বাচনে কী লাভ হলো ইমরান খানের?

নির্বাচনে কী লাভ হলো ইমরান খানের?

পাকিস্তানের পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে সবচেয়ে ব্যাকফুটে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। তবে নির্বাচনের পর দেখা গেল তারাই সবচেয়ে এগিয়ে। সঙ্গে বদলে গেছে রাজনৈতিক দৃশ্যপট। 

গত বৃহস্পতিবার পাকিস্তানে সাধারণ পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৬০ ঘণ্টা পর প্রকাশিত ফলে দেখা যায়, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পেয়েছেন ১০২টি আসন, পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) ৭৪টি এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) ৫৪টি। এ ছাড়া মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট পাকিস্তান (এমকিউএম) ১৭ আসনে জয়ী হয়েছে। অন্য দলগুলো পেয়েছে ১৭টি আসন। পাকিস্তানে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৩৪ আসন। কিন্তু কোনো দলই এই সংখ্যায় না পৌঁছানোয় এখন জোট সরকার গঠন করেন দেশটির রাজনীতিবিদরা।

যখন ইমরান খানকে একের পর এক মামলায় কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হচ্ছিলো, তখন তার দল সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীদের স্বাধীনভাবে নির্বাচনি প্রচারণা চালাতে বেগ পেতে হচ্ছিলো। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেছিলেন যে, পিটিআই ‘সমর্থিত’ প্রার্থীরা হয়তো মাত্র কয়েকটি আসনে জয় পাবে। তবে এই ধারণা শিগগিরই পাল্টাতে শুরু করে।

নির্বাচনের কয়েক দিন চূড়ান্ত ফল আসার পর এখন পুরো দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। ইমরান খান এবং তার দলের সমর্থিত প্রার্থীরা বহু আসনে জয় পেয়ে ফেডারেল এবং প্রাদেশিক পরিষদে যেতে পুরোপুরি তৈরি। কেন্দ্রে এই স্বতন্ত্র প্রার্থীরাই অন্য যেকোনো

রাজনৈতিক দলের চেয়ে বেশি আসনে জয় পেয়েছে। পাঞ্জাব প্রদেশে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে এই স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। আর খাইবার পাখতুনখোয়ায় তারা দুই তৃতীয়াংশ আসনে জয় পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।

এছাড়াও প্রাদেশিক এবং জাতীয় পরিষদের বেশ কয়েকজন প্রার্থী যারা পিটিআই সমর্থিত তারা পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশনে তাদের পরাজয়কে চ্যালেঞ্জ করেছেন। পিটিআই নেতারা দাবি জানিয়েছে, এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া উচিত। তাহলে পরিস্থিতি তাদের জন্য আরো অনুকূল হবে।

বর্তমানে পিটিআই নেতারা যে প্রশ্নের মুখে রয়েছেন তা হচ্ছে, তারা ফেডারেল এবং প্রাদেশিক পরিষদে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কীভাবে প্রমাণ করবেন। একইসঙ্গে তারা কীভাবে সরকার গঠন করবেন, অন্য রাজনৈতিক দল থেকে তাদের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কীভাবে সুরক্ষা দেবেন-সেটাও বড় প্রশ্ন হয়ে সামনে এসেছে।

এখন কারাবন্দী ইমরান খানের সামনে বড় প্রশ্ন, নির্বাচনে তার সমর্থিত প্রার্থীরা যে জনসমর্থন পেয়েছেন তা থেকে তিনি কীভাবে লাভবান হতে পারেন এবং সেটা আসলে কতখানি।

পাকিস্তানের গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ফ্রি এন্ড ফেয়ার ইলেকশন নেটওয়ার্কের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পিটিআই স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এই নির্বাচনে সারা দেশ থেকে ১৬ লাখ ৮০ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছেন। এই জনসমর্থন ইমরান খানকে নিয়ে বর্তমান চিন্তা ও নীতি পরিবর্তন করতে ক্ষমতাসীনদের প্রভাবিত করবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

 

ইমরান খান কি জেল থেকে মুক্ত হবেন?

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অদূর ভবিষ্যতে ইমরান খানের মুক্তির সম্ভাবনা খুব কম। আইন বিশেষজ্ঞ হাফিজ আহসান খোখার মনে করেন, মুক্তি পেতে হলে ইমরান খানকে আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

আদালত বিভিন্ন মামলায় তাদেরকে সাজা দিয়েছে। এসব সাজা স্থগিত বা বাতিল করতে হলে তাদেরকে আদালতে যেতে হবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতি তাদেরকে হয়তো রাজনৈতিকভাবে কিছুটা সুবিধা দেবে, তবে আদালতে এটি তাদের তেমন কোনো কাজে আসবে না।

হাফিজ বলেন, আদালতে মুক্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে ইমরান খানকে অনেক জটিলতা মোকাবেলা করতে হবে। কারণ ‘অনেক মামলায় তিনি দোষ করার কথা স্বীকার করেছেন বলে মনে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সাজা

কমানোর ক্ষেত্রে আইনি ছাড় পাওয়ার সম্ভাবনা কম কারণ কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তার দল কোন সরকার গঠন করছে না।

অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ফেডারেল এবং প্রাদেশিক পরিষদে ইমরান খান সমর্থিত প্রার্থী থাকার মানে হচ্ছে, এই দুই জায়গাতেই ইমরান খানের পক্ষে নানাভাবে আওয়াজ তোলা হবে। এছাড়া ইমরান খানকে যেসব মামলা এবং যে প্রক্রিয়ায় সাজা দেয়া হয়েছে সে বিষয়েও ভিন্ন মত উঠে আসবে।

ইমরান খানের সাজা বাতিল হবে? 

লাহোরভিত্তিক একজন ব্যারিস্টার এবং সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ একজন আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসিকে বলেন, ইমরান খানের সাজা বাতিল করে জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার দুটি উপায় রয়েছে। একটি হচ্ছে, তার দলকে কেন্দ্রে সরকার গঠন করতে হবে, তাকে প্রধানমন্ত্রী হতে হবে, তিনি তখন প্রেসিডেন্টকে বলে তার সাজা বাতিল বা কমিয়ে আনতে পারেন।

এই পদ্ধতিতে তিনি হয়তো বের হয়ে আসতে পারবেন কিন্তু তিনি খালাস পেয়েছেন বলা যাবে না। কারণ এই পদ্ধতিতে তিনি আইনগত বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করার মাধ্যমে খালাস পাচ্ছেন না।

তার মতে আরেকটি পদ্ধতি হতে পারে যে, ‘তার দল সরকার গঠন করলে যেসব প্রতিষ্ঠান তার বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করছে তারা যদি সেগুলো তুলে নেয় তাহলে তিনি বের হয়ে আসতে পারবেন। এর আগেও বেশ কয়েক বার রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষেত্রে আমরা এই ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখেছি।

আইনজীবী ও আইন বিশেষজ্ঞ আসাদ জামালও মনে করেন যে এটা একটা পদ্ধতি হতে পারে। কিন্তু তার মতে, মামলা যদি তুলে নেওয়া নাও হয়, তারপরও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর হাতে আরও বিকল্প থাকবে।

তিনি বলেন, ‘সাজার বিরুদ্ধে তারা আপিল করতে পারবেন এবং তার বিরুদ্ধে যেসব মামলা দায়ের করা হয়েছে সেগুলোর ভিত্তি খুব একটা মজবুত নয়। বরং অনেক অনিয়ম রয়েছে। তাই আদালত তাৎক্ষণিকভাবে সাজা স্থগিত কিংবা বাতিল করতে পারেন।’

তিনি মনে করেন, এসব বিকল্প উপায় অবলম্বন করা তখনই সম্ভব হবে যখন পিটিআই কেন্দ্রে সরকার গঠন করবে।

তবে নওয়াজ শরিফের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান মুসলীম লীগ-পিএমএল-এন ও বিলাওয়াল ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) একজোট হয়ে সরকার গঠন করার সিদ্ধান্ত নেয়ায় সেটা এখন আর সম্ভব হচ্ছে না।

ইমরান খান কি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন?

আইন বিশেষজ্ঞ হাফিজ আহসান খোখার মনে করেন, ইমরান খানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া সম্ভব না। তিনি যদি কোন ভাবে জামিন পেয়ে জেল থেকে বের হয়ে আসেন বা তার সাজা স্থগিতও করা হয়, তাহলেও তিনি একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি। তিনি মজলিস-ই-শূরার সদস্য নন এবং হতেও পারবেন না কারণ তিনি দুটি মামলায় দীর্ঘদিনের সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন। জবাবদিহিতামূলক একটি আদালত থেকেও তার বিরুদ্ধে সাজার রায় দেয়া হয়েছে। যে কারণে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বা কোনও সরকারি পদে আসীন হওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছেন।

হাফিজ বলেন, তিনি অন্তত পাঁচ বছর অযোগ্য হিসেবে থাকবেন এবং এর পাশাপাশি তাকে দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

লাহোরের একজন সংবিধান বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসির সাথে কথা বলেছেন, তিনিও হাফিজ আহসান খোখার সাথে একমত পোষণ করেছেন।

 

Post a Comment

0 Comments